খাওয়ার পানির সন্ধানে হাওরের শিশু
- আপলোড সময় : ২১-১২-২০২৫ ০৯:৩৪:৪২ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ২১-১২-২০২৫ ০৯:৩৪:৪২ পূর্বাহ্ন
দীপু মাহমুদ::
কয়েকদিন আগে কিশোরগঞ্জে গিয়েছিলাম। হাওরের শিশুদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে অজান্তেই শিউরে উঠেছি। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, সেমিনারে আমাদের খাওয়ার জন্য ছোট ছোট পানির বোতল দেওয়া হয়। আমরা সেই বোতলের সবটুকু পানি খাই না। কিছু পানি বোতলে থেকে যায়। অনেক সময় বেশিরভাগ পানিই থেকে যায় বোতলে। খাওয়া হয় অল্প। বোতলে থেকে যাওয়া সেই পানি ফেলে দেওয়া হয়। প্রতিদিন এভাবে সারা দেশে কয়েকশ গ্যালন বোতলজাত খাওয়ার পানি ফেলে দেওয়া হয়। হাওরে চার মাস খাওয়ার পানি থাকে না। মাঘ মাস থেকে বৈশাখ মাস পর্যন্ত পানির স্তর অনেক নিচে নেমে যায়। তখন হাওরের মানুষ, শিশুরা খাওয়ার নিরাপদ পানির অভাবে ভুগতে থাকে তীব্রভাবে। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলা কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা-জুড়ে বিস্তৃত হাওর অঞ্চল আমাদের দেশের অনন্য জলাভূমি। বর্ষায় এই হাওর প্রাণ ফিরে পায়। জলের দিগন্ত, পাখির কলতান, মাছের প্রাচুর্য সব মিলিয়ে তখন প্রকৃতির রঙিন উৎসব শুরু হয়। সারা দেশ থেকে হাজার হাজার পর্যটক ছুটে যান হাওরে, প্রকৃতির সেই অসামান্য সৌন্দর্য উপভোগ করতে। পূর্ণিমার রাতে যখন চাঁদের আলো হাওরের স্বচ্ছ পানিতে প্রতিফলিত হয়, তখন চোখ ধাঁধিয়ে যায়। অতিপ্রাকৃত মনে হয় সবকিছু। কিন্তু বছরের চার মাস মাঘ, ফালগুন, চৈত্র আর বৈশাখ এই একই হাওর, এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। চারপাশে পানি, অথচ খাওয়ার মতো নিরাপদ পানি নেই। চারপাশে পানি, কিন্তু মুখে তোলা যায় না : হাওর প্রকৃতির এক বৈপরীত্য। বর্ষায় ভরা, শুকনো মৌসুমে তৃষ্ণার্ত। পানি সরে গেলেও, পুরোপুরি পানি সরে যায় না। পথ হয়ে থাকে কর্দমাক্ত। তখন না চলে নৌকা, না যাওয়া যায় থকথকে কাদা মাড়িয়ে হেঁটে।
স্থানীয় মানুষ বলেন, এ এক অদ্ভুত সময় না নাও, না পাও। শীত শেষ হতে না হতেই পুকুর-খাল-নদী কাদা আর দুর্গন্ধে ভরে যায়। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যায়, অনেক নলকূপ একেবারেই অচল হয়ে পড়ে। যে পানিটুকু ওঠে, তা আয়রনে ঠাসা। কখনো আবার আর্সেনিক কিংবা ব্যাকটেরিয়ায় ভরা থাকে। কিশোরগঞ্জের নিকলী, সুনামগঞ্জের তাহিরপুর, নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ সব জায়গার চিত্র একই। পানির জন্য কয়েক কিলোমিটার দূরে যেতে হয়। দূর থেকে মানুষ নৌকা বেয়ে খাওয়ার পানি আনে। কেউ হয়তো বৃষ্টির পানি জমিয়ে রাখে, কেউ কাপড়ে ছেঁকে পুকুরের পানি খানিকটা নিরাপদ করে খাওয়ার চেষ্টা করে। তবুও সেই পানি রোগ বয়ে আনে ডায়রিয়া, জন্ডিস, ত্বকের সংক্রমণসহ মারাত্মক সব রোগ। একজন বৃদ্ধ কৃষক বলছিলেন, “আমরা পানির ভেতর থাকি, কিন্তু খাওয়ার পানি পাই না” এই এক কথাতেই হাওরের নিষ্ঠুর বাস্তবতা ধরা পড়ে যায়। স্কুলে নয়, শিশুরা যায় পানির খোঁজে : বছরের শুরুতে শিশুদের যখন নতুন বই হাতে আনন্দ আর উচ্ছ্বাসের সঙ্গে স্কুলে যাওয়ার কথা, তখন শিশুরা বাড়িতে বই রেখে পাত্র নিয়ে দূরে চলে যায় খাওয়ার পানির সন্ধানে। তখন কাদামাটি। নৌকা চলে না। এক হাঁটু কাদা ভেঙে, পানিভর্তি পাত্র নিয়ে তাদের দূর থেকে হেঁটে ফিরতে হয় বাড়িতে। স্কুলে আর যাওয়া হয় না। হাওরের পানি সংকট সবচেয়ে বেশি এবং ভয়ংকরভাবে আঘাত হানে শিশুদের জীবনে। মাঘ-ফালগুন মাসে স্কুলে যাওয়ার সময়ে অনেক শিশুকে কলসি হাতে বের হতে হয়। মায়ের সঙ্গে কাঁধে পানি আনার দায় ভাগ করে নেয় মেয়েশিশুরা। যদি সরু ছোট নৌকা চলার মতো পানির পথ পাওয়া যায় কোথাও, তবে কেউ নৌকা বেয়ে যায় দূরের গ্রামে। কেউ খাওয়ার পানি নিয়ে পথের কাদা মাড়িয়ে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার হেঁটে ফিরে আসে। শিক্ষকরা বলেন, মাঘ থেকে বৈশাখ এই চার মাস স্কুলে প্রায় সব ক্লাসে শিক্ষার্থীদের বেঞ্চ ফাঁকা থাকে। যারা স্কুলে আসে সেই সব শিশুরা পানি বয়ে আনার পরিশ্রমে ক্লান্ত থাকে। পড়ায় বিশেষ মনোযোগ দিতে পারে না।
সারা বছর পড়ার প্রস্তুতি ভালো না হওয়াতে, পরীক্ষার সময় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে যায়। যেখানে শিশুদের সকাল শুরু হওয়ার কথা বই হাতে, বা আমাদের অনেক সন্তানের সকাল সেভাবেই শুরু হয়, পড়াশোনা দিয়ে। সেখানে হাওরের শিশুর সকাল কাটে খাওয়ার পানির সন্ধানে, কলসিভর্তি পানি বয়ে দূর গ্রাম থেকে বাড়ি ফেরে। শুধু পড়াশোনার ক্ষতিই নয়, দূরে গিয়ে পানি আনতে গিয়ে শিশুরা নানা ঝুঁকির মুখেও পড়ে কখনো ছোট সেই নৌকা খাওয়ার পানিভরা পাত্র নিয়ে উল্টে যায়। কাদা মাড়িয়ে ফিরতে গিয়ে পানিভরা পাত্র নিয়ে শিশুরা পিচ্ছিল পথে আছাড় খেয়ে পড়ে যায়, কিংবা অধিক পরিশ্রমে অসুস্থ হয়ে পড়ে।
মাঘের শুরু মানেই দুশ্চিন্তা :
শীতে হাওরের গ্রামগুলোতে শুরু হয় খাওয়ার নিরাপদ পানির চিন্তা। শুকনো মৌসুমে জলাশয়ের পানি নেমে যায়, আর পানির স্তর নেমে যায় এত নিচে যে অনেক টিউবওয়েল থেকে আর পানি ওঠে না। একাধিক পরিবার মিলে একটিমাত্র টিউবওয়েলের পানির জন্য ভিড় করে, অনেক সময় লালচে দুর্গন্ধযুক্ত পানি নিয়েই চলে তাদের দিন। নারী ও শিশুরা তখন দিনভর পানির কলসি ভরার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত থাকে।
আর্সেনিক ও দূষণের ছায়া :
গবেষণায় দেখা গেছে, হাওরের বহু এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক, আয়রন ও ব্যাকটেরিয়ার মাত্রা নিরাপদ সীমার অনেক ওপরে। সে সময়ে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর বা নেত্রকোনার ডিঙ্গাপুতা হাওরে অনেক টিউবওয়েলের পানি খাওয়ার অযোগ্য হয়ে পড়ে। ফলে পরিবারগুলো বাধ্য হয়ে পুকুর বা ধরে রাখা বৃষ্টির পানি খাওয়ার জন্য ব্যবহার করে। এর ফলে শিশুদের মধ্যে ডায়রিয়া, ত্বকের সংক্রমণ, জ্বর এবং জন্ডিস বেড়ে যায়। একজন শিশুর জীবনে খাওয়ার নিরাপদ পানি মানে শুধু তৃষ্ণা মেটানো নয় এটা সুস্থ দেহ ও সম্ভাবনাময় নিরাপদ নিশ্চিত ভবিষ্যতের পূর্বশর্ত। কিন্তু হাওরের শিশুরা প্রতিদিনই সেই সুযোগ হারাচ্ছে। বলা যেতে পারে, সুযোগ নয়, হাওরের শিশুরা তাদের বেঁচে থাকার অধিকার হারাচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ বাড়ছে :
হাওরের পানি সংকট এখন আর কেবল মৌসুমি ঘটনা নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টি অনিয়মিত হয়ে পড়েছে কখনো হচ্ছে অতিবৃষ্টি, কখনো দীর্ঘ খরা। এতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে নাগালের বাইরে, অনেক নিচে। বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের জলবায়ু গবেষণা বলছে, হাওর অঞ্চল বাংলাদেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জলবায়ুপ্রবণ অঞ্চলের একটি। এর প্রভাব পড়ছে নারীদের পাশাপাশি শিশুদের জীবনেও রোগ, পুষ্টিহীনতা, আর শিক্ষাবঞ্চনা এখন হাওরের স্থায়ী সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলো সময়-সময় হাওরে গভীর নলকূপ, সোলার পিউরিফায়ার, ও রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং প্রকল্প চালু করেছে। কিন্তু কাদামাটির কারণে অনেক টিউবওয়েল দ্রুত নষ্ট হয়ে গেছে। সোলার সিস্টেমও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অচল হয়ে পড়েছে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ড্রাম বা ট্যাংক কেবল সীমিত কয়েক ঘরে পাওয়া যায়। ফলে হাওরের পুরো এলাকার মানুষের পানির তৃষ্ণা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। যার ভয়াবহ শিকার হচ্ছে শিশুরা। মাঘ থেকে বৈশাখ এই চার মাস খাওয়ার পানির অভাবে শিশুরা ধুঁকতে থাকে।
জ্ঞান ও টিকে থাকার লড়াই :
সব কষ্টের মধ্যেও হাওরের মানুষ নিজেরাই খুঁজে নিয়েছেন তাদের বাঁচার উপায়। তারা বাইরের সাহায্যের ওপর নির্ভর করে না থেকে নিজ উদ্যোগে কোথাও পুকুরে বালু ফিল্টার বসিয়েছেন, অনেকে বৃষ্টির পানি ধরে রাখেন। সুনামগঞ্জের এক গ্রামে তরুণরা মিলে ‘কমিউনিটি ওয়াটার ব্যাংক’ তৈরি করেছে তারা বৃষ্টির পানি ধরে সারা গ্রামে সরবরাহ করছে। এই উদ্ভাবনী চেষ্টাগুলো প্রমাণ করে, হাওরের মানুষ সাহায্যপ্রার্থী নয়, বরং সমাধানমুখী। তাদের প্রাত্যহিক সংগ্রামই টিকে থাকার পাঠ।
সমাধানের পথ :
১. প্রতিটি স্কুলে রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং সিস্টেম স্থাপন করা জরুরি। এতে শিশুদের জন্য খাওয়ার নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা আসবে। ২. সৌরচালিত পিউরিফায়ার ও বালু ফিল্টার প্রকল্প বাড়ানো দরকার। বিদ্যুৎবিহীন হাওরে এটা কার্যকর হবে। ৩. কমিউনিটি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণই টেকসই সমাধানের পথ স্থায়ী করবে। ৪. জলবায়ু অভিযোজন তহবিল হাওরের জন্য সঠিকভাবে ব্যবহার করা উচিত। শিশুস্বাস্থ্য ও শিশুশিক্ষাকে এখানে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
আমাদের আশা হাওরের শিশুরা স্বপ্ন হারিয়ে ফেলবে না :
হাওরের শিশুরা যেন প্রকৃতির সন্তান নদীর ¯্রােত, ঝুম বৃষ্টি, কখনো প্রখর রোদ্দুর আর কাদা মিশে তাদের জীবন। প্রকৃতি-নির্ভর সেই জীবনের ভেতরেই তারা প্রতিদিন লড়ছে প্রকৃতির প্রতিকূলতার সঙ্গে। মাঘ থেকে বৈশাখ এই চার মাস তাদের জন্য যেন এক অনন্ত সংগ্রামের সময়। একজন শিশুর শৈশব কাটার কথা বই, খাতা, খেলাধুলা আর স্বপ্নের ভেতর। কিন্তু হাওরের শিশুরা শৈশব কাটায় খাওয়ার পানির কলসি হাতে।
কলসি কাঁধে নিয়ে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা যখন ভোরে খাওয়ার নিরাপদ পানির সন্ধানে বের হয়, তখন তাদের চোখে ঘুম থাকে না, থাকে দায়িত্ব। কেউ কেউ স্কুলে যেতে পারে না, কেউ আবার স্কুলে গেলেও ক্লাসে গিয়ে মাথা নিচু করে বসে থাকে, তৃষ্ণায় ঠোঁট ফেটে যায় তবুও বইয়ের পাতায় আঙুল বুলিয়ে তারা শেখার চেষ্টা করে। তাদের ক্লান্ত শরীর, বিষণœ অসহায় অনিশ্চিত দৃষ্টি আর ফাটা পায়ের তলায় লেগে থাকে কাদামাটি যে মাটি তাদের ভবিষ্যৎ গড়বে। কিন্তু সময়মতো খাওয়ার জন্য নিরাপদ পানি আমরা দিতে পারি না। হাওরের শিশুরা জানে না আর্সেনিক কী, তারা শুধু জানে পুকুরের পানি খেলে পেটে ব্যথা করে। তারা জানে না ‘জলবায়ু পরিবর্তন’ মানে কী, তারা কেবল বোঝে আকাশে মেঘের রঙ বদলে গেলে আর বৃষ্টি হবে না, খাওয়ার জন্য ধরে রাখার পানিটুকু তারা পাবে না। তবু হাওরের শিশুদের কোনো অভিযোগ নেই, তাদের মুখে আছে হাসি। সেই হাসির আড়ালে আছে আমাদের ভবিষ্যতের আশা। আমরা যদি এখনই হাওরের পানির এই সংকটে মনোযোগ না দিই, তবে একদিন এই শিশুরা বইয়ের বদলে বালতি হাতে বড় হবে, ক্লাসরুমের বদলে পানির সন্ধানে ছোটাছুটি করবে। যদি আজই আমরা তাদের পাশে দাঁড়াই তাদের জন্য যদি খাওয়ার নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে পারি, তবে তারাই একদিন এই দেশকে নেতৃত্ব দেবে। এই শিশুরা যখন বড় হবে, তারা হয়তো নতুন প্রযুক্তি, নতুন ধারণা আর নতুন মানবিক মূল্যবোধ দিয়ে এই হাওরকেই রক্ষা করবে। যাদের জন্য এই লেখা সেই শিশুদের কেউ একজন নিশ্চয় স্বপ্নে বিশ্বাস রাখছে। হাওর শুধু একটি ভূগোল নয়, এটা বাংলাদেশের প্রাণ, সংস্কৃতি আর খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তি। প্রত্যেক শিশুর নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করতে আমাদের প্রথম অঙ্গীকার হওয়া উচিত প্রত্যেক শিশুর জন্য খাওয়ার নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা বিধান করা। হাওরের শিশু যখন তৃষ্ণার্ত হয়, তখন সে কেবল পানির তৃষ্ণায় ভোগে না, সে ধুঁকতে থাকে শিক্ষা আর জীবনের মর্যাদার নিষ্ঠুর তৃষ্ণায়। [সংকলিত]
[লেখক: চাইল্ড কেয়ার ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এডুকেশন কনসালট্যান্ট, ইউনিসেফ]
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সুনামকন্ঠ ডেস্ক